নারায়নগঞ্জের ৭ খুনের ভয়ঙ্কর দিন আজ,প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাঁদাছে পরিবার

নারায়ণগঞ্জ নিউজ ২৪ ডট কম: আজ সেই বিভীষিকাময় দিন। যে দিনটিতে পেশাদার দুর্বৃত্তদল পথের কাঁটা সরাতে অপহরণ করেছিল নারায়ণগঞ্জের সাতজন মানুষকে। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে রচিত হয় গাঁ হিম করা ভয়ংকর সাত খুনের কালো অধ্যায়।

আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অপহরণ করে নৃশংস কায়দায় খুন করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবি চন্দন সরকার সহ সাতজনকে। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাতখুনের ৬ বছর পূর্ণ হল আজ। ৬ বছর পূর্ণ হলেও সম্পন্ন হয়নি দেশব্যাপী আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারি এই মামলার বিচার । সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে শুনানীর অপেক্ষায় আছে মামলাটির বিচারকার্য। বিচারের আশায় দীর্ঘ ৬ বছর ধরে প্রহর গুনছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনরা।

খুনিদের পক্ষ থেকে নিরন্তর আসে হুমকী ধামকি। সেই সকল হুমকী ধামকি উপেক্ষা করে আজো বিচারের আশায় দিন গুণছে নিহতদের স্বজনরা। আদালতে হাজির করা হলে এখনো মুচকি হাসে কুখ্যাত সন্ত্রাসী নুর হোসেন।

তার ভাবটা এমন যে, আদালতের রায় কোনদিন কার্যকর হবে কিনা-সেটা একটা প্রহেলিকা। কিন্তু নিহতের স্বজনদের বিশ্বাস বাংলার মাটিতে এই খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবেই। নিহতদের একাধিক পরিবারের অভিযোগ, মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়ায় মামলার আসামীপক্ষের লোকেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নিহতদের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছে।

ভয়ে বাসা-বাড়ি থেকে বের হওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে তাদের। আলোচিত এ মামলায় ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ৩৮টি কর্মদিবসে ১০৬ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আদালতের দেয়া রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়।

রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন। পরবর্তীতে আসামীপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে। এরপর ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট বিচারিক আদালতে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট।

বাকি ১১ জনের মৃত্যুদন্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পরে আসামীপক্ষ আবারো এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর দুই মামলায় মোট ১৫৬৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন হাইকোর্ট।

সূত্রমতে, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন: সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, এ বি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন : সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট এনামুল কবির, নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান, সেলিম, সানাউল্লাহ, শাহজাহান ও জামালউদ্দিন।

এদিকে, গত ৬ বছর যাবৎ বিচারের আশায় প্রহর গুণছেন সাতখুনের শিকার পরিবারগুলো। উচ্চ আদালতে রায় ঘোষণার পরও মামলার বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে হতাশ নিহতের পরিবার ও স্বজনরা। নিহতদের পরিবারের দাবি , এ হত্যাকান্ড সম্পর্কে প্রতিটি মানুষেরই জানা। রায়ও প্রকাশ হয়েছে। তাহলে কেন এত সময় লাগছে ?
মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে নিহত তাজুল ইসলাম রাসেলের মা তাসলিমা বেগম ও বাবা মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, ‘আমরা বিচার আশায় আছি। এতদিন তো নানাভাবে দেরি করেছে। এখন তো আবার করোনাভাইরাসের প্রকোপ।

এখন কবে এ বিচার হবে বা আদৌতে হবে কিনা তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই। আমাদের সরকারের কাছে একটাই দাবি এ বিচার দ্রুত করা হোক। আসামীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা হোক।

তাজুলের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম রাজু জানান, তিন বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে মামলায় রায় দেয়া হয়েছে কিন্তু রায় আজও কার্যকর হয়নি। সবকিছু প্রমানিত হয়েছে সারাদেশ এ ঘটনা জানে। আসামীরাও স্বীকার করেছে।

তাহলে এত দেরী হচ্ছে কেন? এদিকে আসামীপক্ষের লোকেরা বিভিন্ন সময় আমাকে ও আমার পরিবারকে নানাভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে। ছোট ভাইটা স্কুলে পড়ে । এ মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় না শান্তি পাবো।

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়ির চালক নিহত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শামসুন্নাহার নুপুর জানান, তার মৃত্যুর সময় তখন আমি আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা ।

জন্মের পর আমার মেয়েটা তার বাবার আদরটাও পায়নি। যাদের জন্য আজকে স্বামীহারা আমার সন্তান বাবা হারা আমি তাদের শাস্তি চাই। এমন খুনের শাস্তি যদি না হয় তাহলে বিচার বিভাগ থেকে কি লাভ।

শামসুন্নাহার বলেন, মেয়ে বড় হচ্ছে। এখন সে বাবাকে চায়। তার ভরণ পোষণ। এখন বড় হচ্ছে ।তারওপর পড়াশুনার খরচ এখন যুক্ত হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। শ্বশুর-শাশুড়ি,ভাসুর,দেবর সবাই সবার সাধ্যমত চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ । জন্ম থেকে বাবাকে পেল না। না একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে পারছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাক্ষাতের জন্য যখন গিয়েছিলাম সে তখন বলেছিলো যে সে আমাকে দেখবে। কিন্তু এখন তো আমি আমার স্বামী হত্যারই বিচারই পাই না
নারায়ণগঞ্জ আদালতে বাদীদের পক্ষে সাতখুন মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, সারা বাংলাদেশের মানুষ সাতখুনের বিষয়ে অবগত। মামলার রায়ও ঘোষণা হয়েছে।
উচ্চ আদালতে যখন মামলার রায় প্রকাশ করা হয়েছিলো তখন আশা করেছিলাম এ মামলার আসামীদের বিচার সম্পন্ন হবে। কিন্তু মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হওয়ার পরেও আপিল বিভাগে মামলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

তিনি আরো জানান, মামলা বিচারকার্যে এ দীর্ঘসূত্রিতা খুবই হতাশাজনক। আমরা চাই সরকার এ নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করুক।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবি চন্দন সরকার সহ সাতজন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর শান্তির চর এলাকায় তিনদিন পর ৩০ এপ্রিল ও ১ মে অপহৃত এই সাত জনের লাশ ভেসে উঠে ।

নিহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহিম। ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।

আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় ১১ মে একই থানায় চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদি হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করলে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে পুলিশ।

পরবর্তিতে ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৩৫ জনকে আসামী করে পুলিশ চার্জ গঠন করে।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment