ফতুল্লার প্রধান সড়ক ফাঁকা, পাড়া-মহল্লায় আড্ডা

রাকিব চৌধুরী শিশির : করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ঘরে অবস্থান করা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানপাট ছাড়া অন্যান্য দোকানপাট না খোলাসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ফতুল্লার বিভিন্ন স্থানে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দোকানপাট খোলা সহ অপ্রয়োজনে রাস্তাঘাট ও পাড়া-মহল্লায় মনগড়া মত চলাফেরা করছে সাধারন মানুষ। রমজান মাস হলেও পর্দা ঝুলিয়ে দিনে ও গভীর রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানে চলছে আড্ডাবাজি। ফতুল্লায় প্রশাসনের করোনা ভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে ঘরের বাহির না হতে এবং একত্রে আড্ডা দিতে বা ঘোরাফেরা না করতে ব্যাপক সচেতনতায় প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও নির্দেশনা মানছেন না সাধারন মানুষ।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) সরেজমিনে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অপ্রয়োজনে চায়ের দোকানে আড্ডা, ঘুরাফেরাসহ রাস্তাঘাট ও পাড়া-মহল্লায় জনসমাগম এবং যাতায়াত করতে দেখা গেছে। সরেজমিনে ফতুল্লার রেলস্টেশন বাজার, বটতলা রেললাইন, পোস্টঅফিস, বউবাজার, ব্যাংক কলোনী, লামাপাড়া, লালপুর, পৌষার পুকুরপাড়, দক্ষিণ শিয়াচর, লালখা, বায়তুল ফালাহ রোড, তক্কার মাঠ, সস্তাপুর, রামারবাগ, পাগলা, রসুলপুর, কুতুবপুর, পঞ্চবটি, ভোলাইল, নন্দলালপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় এ জনসমাগমের চিত্র দেখা যায়।

এই সকল এলাকার প্রধান সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোরভাবে অবস্থান নেওয়ার ফলে প্রধান সড়কে হাতে গোনা কিছু যানবাহন চোখে পড়েছে। তারপরেও পুলিশের চেকপোস্টে যানবাহনগুলোর চালককে জবাবদিহি করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি এলাকার ভিতরের রাস্তায় বা মহল্লার রাস্তায় ছিল ভিন্নচিত্র। সকাল থেকেই পাড়া মহল্লায় প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মানুষকে রাস্তায় আড্ডা দিতে দেখা গেছে।

লালপুর পৌষার পুকুরপাড় এলাকায় দেখা গেছে, তিন চারজন মিলে কথা বলছেন দাঁড়িয়ে। তারা করোনা ভাইরাস নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু নিজেরা সতর্ক হচ্ছেন না। ওই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুদি দোকানদার বলেন, আমি সকাল থেকে দোকানে থাকি। দোকানের সামনে দিয়ে অনেকেই আসা যাওয়া করেন। অনেকে কিছু কেনাকাটা করতে আসেন আবার অনেকে হাঁটাহাঁটি করতে বের হয় রাস্তায়। আবার অনেককে অযথা গল্প করতেও দেখা যায়।

পথচারী যোবায়ের আহমেদ বলেন, সারাক্ষণ বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগে না। গত কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি রয়েছি। আজ একটু বের হলাম বাইরের কী অবস্থা সেটা দেখার জন্য। করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে সরকার সবাইকে বাসায় থাকতে বলেছেন। তারপরেও কেন বের হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমাদের সবার উচিত বাসায় থাকা। কিন্তু এটাওতো বুঝতে হবে একটা মানুষ কতক্ষণ বাসায় থাকতে পারে। তবে বাসার বাইরে বের হলে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস পরে বের হতে হবে। আমিও তাই করেছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য বলেন, আমরা খুব কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করছি। কেউ যদি প্রয়োজন ছাড়া বের হয় তাহলে তাৎক্ষণিক তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি বলেন, মানুষ আসলে অনেক চালাক। আমরা প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়েছি বলে মহল্লার রাস্তায় বের হয়ে ঘোরাঘুরি করে। আবার আমরা যখন মহল্লার রাস্তায় টহল দিতে যাই তখন আমাদের দেখে সবাই বাসায় ঢুকে যায়। আমরা চলে গেলে আবার বের হয়। এমন করলে কীভাবে সবাই নিরাপদে থাকবে।

পাগলার কুতুবপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, এলাকায় কেউই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম মানে না। এমনকি স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলীয় নেতারাও এই নিয়ম মানেন না। দলের নেতাকর্মী নিয়ে জমিয়ে আড্ডা দেন। ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় গেলে মনেই হবে না দেশে কোনো নিষেধাজ্ঞা চলছে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে ফতুল্লা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম জানান, আসলে আমরা নিজেরাই সচেতন না। পুলিশের গাড়ি দেখলে সরে যায়, পুলিশের গাড়ি চলে গেলে আবার বের হয়ে আড্ডায় মেতে ওঠে। আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও তৎপর হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি রণজিৎ মোদক বলেন, সরকার ঘরে থাকা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশ দিলেও অনেকেই তা মানছে না। বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানে এক শ্রেণীর উঠতি বয়সের যুবক ও বৃদ্ধরা আড্ডা দিচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক! সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বারবার ঘর থেকে বের না হতে এবং ঘোরাফেরা না করতে নিষেধ করলেও তারা এ বিষয়ে কর্ণপাত করছে না। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি এলাকায় এলাকায় আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত।

রাস্তায় কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, বাইরে বের হওয়া মানুষগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে অনেকেই বলছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হয়েছেন। মূলত ঝামেলা এড়াতেই তারা এ ধরনের মিথ্যাচার করছে। কড়াকড়ি আরোপ এবং অনুরোধের পরও পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলোতে যুবক-বৃদ্ধ এমনকি স্কুল ছাত্রদের আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে করোনা নিয়ে সচেতনতার কিছুই নেই। শুধু চায়ের দোকানে নয়, রাস্তার মোড়, অলি-গলি, বাড়ির ছাদ ও সিঁড়িতে জটলা পাকিয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায় লোকজনকে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়ি দেখলে লোকজন দ্রুত সরে যায়। দোকানিরাও তালা দিয়ে সরে যায়, পরে আবার দোকান খোলে।

এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসলাম হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। এলাকায় এলাকায় গিয়ে নিজেরা সচেতনতার লক্ষ্যে কথাবার্তা বলছি। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশ, মেম্বার, চেয়ারম্যান ও এলাকার মুরুব্বিদের দিয়ে সচেতন করাচ্ছি। মা বলতেছে তার ছেলেকে বাসায় রাখতে পারছে, বাড়িওয়ালা বলতেছে ভাড়াটিয়া কথা শুনে না। এখন সবাইকেই সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো যেখানে যেভাবে করার দরকার করতেছি, সবাইকে (ওহপষঁফব) অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে মা-বাবাকে, দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের লোকজনদের। তারপরও সবাইকে সম্পৃক্ত করে অলি-গলির ভিতরে গিয়ে সবাইকে বাসায় থাকার নির্দেশনা দিচ্ছি।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment