পেটের ক্ষুধায় ভুলে গেছে জীবনের মায়া, ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরছে মানুষ

সাদিয়া আফরিন মাহি : করোনা ভয়কে পাত্তা না দিয়ে পেটের দায়ে রাজধানীতে ফিরছে মানুষ। লকডাউন না মেনে জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা আসা শুরু করেছে তারা। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা চাকরি বাচানোর তাগিদের প্রানের ভয়কে তুচ্ছ করে গার্মেন্ট অধুষ্যিত এলাকায় ফিরছে। পেটের খুদায় ভুলে গেছে জীবনের মায়া

মুন্সিগঞ্জ থেকে আব্দুস সালাম জানান,
শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ-রুট দিয়ে ফেরিতে করে পদ্মা পার হচ্ছেন কয়েক হাজার গার্মেন্টকর্মী। বুধবার সকাল থেকে এসব যাত্রীকে কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরিতে করে শিমুলিয়া ঘাটে এসে ঢাকার উদ্দেশে বিকল্প যানবাহনে যেতে দেখা গেছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এমন দৃশ্য দেখে হতবাক পুলিশ প্রশাসন।

সকাল ১১টার দিকে রো-রো ফেরি শাহ পরান ও ডাম্প ফেরি রামশিং ভর্তি গার্মেন্টকর্মী পদ্মা পাড়ি দিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসে পৌঁছান। এরপর শিমুলিয়াঘাট থেকে তারা সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা রিকশায় চড়ে আবার কেউ হেঁটেই ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দেন। করোনার কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকামুখী গার্মেন্টকর্মীদের এমন ভোগান্তির চিত্র ফুটে উঠেছে।

সকালে সরেজমিন শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক হাজার যাত্রী দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকায় যাচ্ছে। এসব যাত্রীর অধিকাংশই গার্মেন্টকর্মী। তারা দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিকল্প যানবাহনে করে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে এসেছেন। সেখান থেকে ফেরিতে করে কয়েক হাজার যাত্রী পদ্মা পাড়ি দিয়ে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছান। করোনার কারণে পরিবহন বা বাস বন্ধ থাকায় এসব যাত্রী বিকল্প যানবাহনে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গন্তব্যে ছুটছে। এসব যানবাহনের মধ্যে রয়েছে, আটোরিকশা, ইয়েলো ক্যাব, রেন্ট-এ-কার, মাইক্রোবাস ও পিকআপ ভ্যানসহ লোকাল নানা ধরনের যানবাহন।

মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ সিরাজুল কবির জানান, বুধবার সকাল থেকেই কয়েক হাজার গার্মেন্টকর্মী দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসেছেন। এখান থেকে বিকল্প যানবাহনে তারা গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। এদের অধিকাংশই গার্মেন্টকর্মী।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ-রুটে দিনে ছয়টি ফেরি চলাচল করছে।

বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো: শফিকুল ইসলাম জানান, দিনে ছয়টি ফেরি চালাচল করে আর রাতে চলে চারটি। প্রত্যেকটি ফেরি ভর্তি হয়ে পারাপার হচ্ছে গার্মেন্টসকর্মী। সকাল থেকে কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে শিমুলিয়াঘাটে আসছেন তারা। গার্মেন্টসের চাকরিতে যোগ দিতে ঢাকায় ছুটে যাচ্ছেন।

মfনিকগঞ্জ খেকে শাহীন তারেক জানান,
পোশাক কারখানা খুলে দেয়ায় চাপ বেড়েছে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল থেকে এই রুটে ঢাকায় ঢুকছেন শত শত মানুষ। এদিকে, ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি নির্দেশনা মেনেই সীমিত আকারে ফেরি চলাচল করছে।

একদিকে করোনা আতঙ্ক অন্যদিকে চাকরি হারানোর ভয় নিয়েই কর্মস্থলে ফিরছেন পোশাক শ্রমিকরা। বুধবার সকাল থেকে দলে দলে মানুষকে নৌপথ পার হতে দেখা যায়।

ফেরিগুলোতে গাদাগাদি করে পোশাক শ্রমিকদের ঘাট পার হতে দেখা যায়। গণপরিবহন না থাকায় ছোট ট্রাক, মোটরসাইকেল ও পিকআপে চারগুণ ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলে ফিরছেন তারা।

একজন নারী বলেন, কাজে না আসলে বেতন, বকেয়া বেতন দেবে না বলছে।

আরেকজন বলেন, অফিস দিয়ে ফোন করে বলছে, তাড়াতাড়ি না আসলে তোমার চাকরি থাকবে না। বেতন দেয়া হবে না।

এদিকে, সরকারি নির্দেশনা মেনেই সীমিত আকারে ফেরি চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন পাটুরিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক।

পাটুরিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক সালাম হোসেন বলেন, সরকারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অ্যাম্বুলেন্স-পণ্যবাহী যানবাহন পারাপারের জন্য সীমিতভাবে ৩টি ফেরি চলছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যানবাহন পারাপারের জন্য ১৭টি ফেরির মধ্যে ছোট-বড় ৪টি ফেরি চলাচল করছে।

করোনার হটস্পট নারায়ণগঞ্জে খুলছে ১৫৮ গার্মেন্টস

করোনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত জেলা নারায়ণগঞ্জে লকডাউন পরিস্থিতিতেও ফতুল্লার বিসিক ও সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী ইপিজেডেসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অধিকাংশ গার্মেন্টস চালু করা হয়েছে। শারীরিক দূরত্ব না মেনেই সকাল থেকেই নিজ নিজ কর্মস্থলে দলে দলে যোগ দেন শ্রমিকরা।

গত দুইদিনে ১শ’ ৫৮টি রপ্তানিমূখী গার্মেন্টস কারখানা সীমিত আকারে খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি জানান, এসব গার্মেন্টস কারখানায় শুধুমাত্র নিটিং, ডাইং ও স্যাম্পল বিভাগ খোলা হলেও করোনা ঝুঁকির কারণে উৎপাদন বিভাগ বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই সীমিত পরিসরে কারখানা খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং আগামী ২ মে থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে।

তবে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের দাবি, জেলায় করোনার বর্তমান পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত না করেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে শ্রমিকদের। এ অবস্থায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয় বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। পরবর্তীতে সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে তা ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এরপর রোববার থেকে সীমিত পরিসরে ধাপে ধাপে কারখানা খোলার সিন্ধান্ত নেয় সংগঠন দুটি।

জেলা পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, করোনা সংক্রমণ রোধে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে। সেই বিধি তাদের মেনে চলার কথা রয়েছে।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment