সোনারগায়ে ১৫ মাসে ৩জন ইউএনও বদলী, নেপথ্যে কি?

ছবি : সোনারগায়ে পরপর বদলি হওয়া ইউএনও অঞ্জনকুমার সরকার, রকিবুর রহমান ও সাইদুল ইসলাম

* সরকারি কর্মকর্তাদের চাইতে অপরাধীচক্র বেশী প্রভাবশালী !

নারায়ণগঞ্জ নিউজ ২৪ ডট কম :
চলতি বছরের ১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেছেন ৩০তম বিসিএস’র(প্রশাসন) সাইদুল ইসলাম। মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় তাকে চলে যেতে হয়েছে সোনারগাঁও ছেড়ে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন টাঙ্গাইল থেকে আগত আতিকুল ইসলাম। ইউএনও সাইদুল ইসলামকে বদলি করার আগে মাত্র ৩ মাসের মাথায় চলে যেতে হয়েছে তার পূবসূরী ইউএনও রকিবুর রহমান খানকে। এভাবে গত ১৫ মাসে সোনারগাঁও উপজেলা থেকে বদলি হয়েছেন ৩জন ইউএনও,একাধিক এসিল্যান্ড ও ইউনিয়ন ভুমি কর্মকর্তা।
নারায়ণগঞ্জ জেলার বাকী ৪টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারদের কেউ ২ বছরে আবার কেউ ২ বছরের বেশী সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন তবে সোনারগায়ের ইউএনওদের কেন বার বার বদলী করা হচ্ছে তা নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নানা রকম চমকপ্রদ কাহিনী।

স্থানীয় একধিক সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছেন, সোনারগায়ের একটি অপরাধীচক্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাদের কথা মতো কাজ না হলে নেমে পড়েছে বদলি করার মিশনে।
বালুমহল ইজারা, ভুমি দখল , বিভিন্ন আবাসন কোম্পানীর নামে জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে তাদের কথা মতো কাজ না করলে ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়সহ বিভিন্ন স্থানে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে। দুষ্টুচক্রের অনেকে নামে বেনামে এসব অভিযোগ দায়ের করার পর ঐ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য সচিবালয়ে তদবির করেন আরেকটি প্রভাবশালীমহল। গত ১৫ মাসে এমন তদবিরের কারনে সরানো হয়েছে তিনজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, বারবার ইউএনও বদলি করার ফলে মাঠ প্রশাসনের কাজে মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে পাশাপাশি লাভবান হচ্ছে অপরাধি চক্র ।
সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সোনারগাঁ উপজেলা। দেশের বড় বড় শিল্পগ্রæপের প্রতিষ্ঠানসহ অনেকগুলো অর্থনৈতিক জোন রয়েছে এই উপজেলায়। জাহাজ নির্মান প্রতিষ্টানসহ রয়েছে একধিক ডকইয়ার্ড।

এছাড়া বালু আর জমির জন্য এই উপজেলা বিভিন্ন সময় সংবাদের শিরোনাম হয়। সোনারগাঁয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বালুমহাল। উপজেলার বারদি, পিরোজপুর, বৈদ্যেরবাজার ও শম্ভুপুরা ইউনিয়নে মেঘনা নদীতে ১৪টি বালুমহাল রয়েছে। বাৎসরিক ইজারার মাধ্যমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার নির্মাণ ও নিচু ভূমি ভরাট করার কাজে এসব বালুমহাল থেকে উত্তোলন করা বালু ব্যবহার করা হয়। বালু আর জমির দখল রাখতে প্রভাবশালী একটি মহল প্রশাসনের উপর সব সময় প্রভাব খাটাতে চায়। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন সুবিধা নেওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই প্রভাবশালী মহলটিতে কয়েকজন জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী এই মহলটির স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলেই তারা সরকারি কর্মকর্তাদের বদলির মিশনে নামেন।

গত ১ মার্চ ইউএনও সাইদুল ইসলাম যখন যোগদান করেন তখন সারাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে করোনা ক্লাস্টার, হটস্পট,এপিসেন্টারসহ নানাভাবে আলোচনায় ছিল নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু মহামারি করোনায় ঝুঁকি উপেক্ষা করে দায়িত্ব নিয়েই সোনারগাঁবাসীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন তিনি। এছাড়া উপজেলা চত্তর থেকে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ফেষ্টুন অপসারণ,ভুমি দস্যুতা বন্ধ,বালুমহলের অনিয়ম বন্ধসহ যখন কাজ শুরু করেন। তখনই তার বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। তাকে সরিয়ে দেয়ার মিশনের নামে দুষ্টুচক্রটি।
রাতের আঁধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন ও উপজেলা পরিষদ চত্ত¡রের সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর, চত্ত¡র থেকে মোটর সাইকেল চুরির ঘটনাও ঘটে। তাকে সরিয়ে দেয়ার অংশ হিসেবে জন্য এক ঠিকাদার দুদকে অভিযোগ করেন। ঐ ঠিকাদার একটি স্কুলের কাজ না পেয়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।
সদ্য সাবেক ইউএনও সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে চেক বিতরণে অনিয়ম করার অভিযোগও তোলা হয়। যদিও এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। দুদকে এমন অভিযোগ দায়েরের পেছনেও প্রভাবশালী ওই মহলটির হাত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সাইদুল ইসলামের ভাষ্য, এই ঠিকাদারের পেছনে নিশ্চয়ই প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে ।

গত ১০ জুন রাতের আঁধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, উপজেলা পরিষদ চত্ত¡রের সিসি ক্যামেরা বিকল করা হয়। চুরি হয়ে যায় একটি মোটরসাইকেল। বিষয়টিকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী নির্বাহী সাইদুল ইসলাম।
এর আগে ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার। ওই বছরেই ১১ নভেম্বর তাকে বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন রকিবুর রহমান খান কিন্তু ৩ মাসের মাথায় তাকেও বদলি করা হয়।
বদলির পূর্বে তার বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ তোলেন জনপ্রতিধিরা। একই কারণে পরপরদুটি মাসিক সভাও বর্জন করেন স্থানীয় (নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন) সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকা ও জনপ্রতিনিধিরা। সাবেক এই ইউএনওর বিরুদ্ধে সরকারি কয়েকটি দপ্তরে চিঠিও দেয় জনপ্রতিনিধি ঐক্য ফোরাম। পরে গত ১৬ ফেব্রæয়ারি তাকে বদলি করার পর সাইদুল ইসলাম সোনারগাঁয়ে ইউএনও হয়ে আসেন। ইউএনও রকিবুর রহমান ও অঞ্জনকুমার সরকারকে বদলি করানোর পেছেনে রয়েছে এই প্রভাবশীলী চক্রের হাত।

স্থানীয় আওয়ামীলীগের একটি সূত্র জানায়, এখানে ইউএন হিসেবে যারা আসনে তারা অনিয়ম বন্ধের চেষ্টা করেন । নানা রকম অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হন। কিন্তু যারা অপরাধ করে আর তাদের যারা শ্লেটার দেন তারা খুবই প্রভাবশালী। তাদের সাথে টক্কর দিয়ে কোন সরকারি কর্মকর্তা এখানে থাকতে পারেন না।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment