পথে পথে যাত্রীদের ভোগান্তি, ক্ষোভ

নারায়ণগজ্ঞ নিউজ ২৪ ডট কম : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গণপরিবহনে যাত্রী সংখ্যা সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর রাজধানীতে বাস সঙ্কট ও ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ ছিল বৃহস্পতিবারও । পথে পথে ছিল যাত্রীদের দীঘ লাইন।

বৃহস্পতিবার সকালে অফিসগামী যাত্রীদের রাস্তায় নেমে ভুগতে হয়েছে আগের দিনের মতই। ঢাকা বিমানবন্দর, মহাখালী, কাকরাইল, শাহবাগ, পল্টন, প্রেসক্লাব ও গুলিস্তান এলাকায় বিপুল সংখ্যক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। ক্ষুব্ধ যাত্রীরা সকালে ক্ষিলখেতে রাস্তা আটকে বিক্ষোভও করেছেন।
তাদের অভিযোগ সরকারের বিধিনিষেধের সুযোগ নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ‘কৃত্রিম সঙ্কট’ তৈরি করেছে; আদায় করা হচ্ছে ‘দুই থেকে তিনগুণ’ ভাড়া।
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করার পর বুধবার থেকে অর্ধেক আসন খালি রেখে গণপরিবহন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
রাজধানীর বেশির ভাগ রুটে বেসরকারি যে মিনিবাসগুলো চলাচল করে, সেগুলো কমবেশি ৫০ আসনের। সরকারি নির্দেশনা পাওয়ার পর অর্ধেক আসন খালি রেখে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে সেগুলোর যাত্রী পরিবহন করার কথা।
অফিস-আদালত, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে বাসে কম যাত্রী পরিবহনের এ নির্দেশনায় বিপাকে পড়েছে রাজধানীবাসী।

অফিসগামী যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাসে উঠতে না পেরে প্রতিবাদ জানাতে সকাল ৯টার দিকে খিলক্ষেতে রাস্তা অবরোধ করলে পুরো বিমানবন্দর সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ জট সৃষ্টি হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার-বনানী থেকে উত্তরা পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
মিজানুর রহমান নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “সকালে অফিস টাইমে লোকজন বাসে উঠতে না পেরে কিছুক্ষণ রাস্তা আটকে রাখে। পরে পুলিশ এসে সবাইকে বাসে উঠিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।”
খিলক্ষেত এলাকার আমজাদ হোসেন জানান, “করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় বাসগুলো অর্ধেক যাত্রীর বেশি তুলছে না। এর ফলে অফিসগামী মানুষরা অনেকেই বাসে উঠতে পারছেন না। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে খিলক্ষেত ওভার ব্রিজের নিচে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নেন।”
মিরপুর থেকে গুলিস্তানে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল আসলাম জানান, ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর তিনি বাস পেয়েছেন। ৩০ টাকার ভাড়ার বদলে গুণতে হয়েছে ৭০ টাকা।
“ভাড়া আরও ১০ টাকা বেশি নিলেও উঠতে হত। আমার মনে হয় একটা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভাড়া বেশি দিতে হয়।”

একই ধরনের অভিযোগ তেজগাঁও থেকে কাকরাইলে আসা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের। তিনি বলেন, “আমরা তেজগাঁও থেকে কাকরাইল মোড়ে যাই ১০ টাকা দিয়ে। আজকে গাজীপুর পরিবহনে এসেছি, সবসময় তারা ১০ টাকা ভাড়া নেয়, আজকে নিয়েছে ৩০ টাকা।”
“আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বাস পেয়েছি, সেখানে আবার ভাড়া বেশি। আমার মনে হয় ভাড়া বেশি নিতেই তারা রাস্তায় বাস কম নামিয়েছে।”

গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের যাত্রী মোজাহিদ হোসাইন বলেন, “বাস ভাড়া ৫ টাকা ছিল। আজকে ১৫ টাকা চাচ্ছে। ভাড়া তো ৫ টাকার জায়গায় হওয়ার কথা ৮ টাকা, কিন্তু তারা নিচ্ছে ১৫ টাকা।”

সকাল ১০টার দিকে খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দেখা যায় অন্তত ৫০ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু বাসের দেখা নেই।

যাত্রীদের অভিযোগ, অন্যদিন বাসে যাত্রী তোলার জন্য চালকের সহকারীরা ডাকাডাকি করত, এখন পরিস্থিতি পুরো উল্টো। পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, “এক ঘণ্টা ধরে বাসের জন্য অপেক্ষায় আছি, বাস নেই।”

তবে বাসের ‘কৃত্রিম সঙ্কট’ সৃষ্টির অভিযোগ মানতে রাজি নন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ।তিনি বলেন, “সঙ্কট কেন হবে? বাস যা ছিল তাই রাস্তায় আছে।”
ভাড়া বেশি নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাস ভাড়া বেশি নিলে বি আরটিএ-র ভ্রাম্যমাণ আদালত শাস্তি দেবে।”

এদিকে বাসের সঙ্কট আর ভাড়া নিয়ে যাত্রীরা অভিযোগ করলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতা দেখা গেছে। বাস চালক বা সহকারীরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীরা মাস্ক ছাড়াই বাসে চড়ছেন। চালক ও সহকারীর মুখের পরিবর্তে থুতনিতে মাস্ক ঝুলতে দেখা গেছে। বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ মোড়ে সাভার পরিবহনের একটি বাসে দেখা যায় বেশিরভাগ যাত্রীর মুখে মাস্ক নেই।

মাস্ক-ছাড়া যাত্রী পরিবহন করছেন কেন জানতে চাইলে চালকের সহকারী সজীব বলেন, “অনেকে মাস্ক মুখে লাগিয়ে ওঠেন, কিন্তু সিটে বসেই মাস্ক খুলে ফেলেন।”
একই বক্তব্য রজনীগন্ধা পরিবহনের চালকের সহকারী জনির। তিনি বলেন, “আমরা মাস্কের কথা বলতে বলতেই যাত্রীরা গাড়িতে উঠে পরেন। অনেকে মাস্ক খুলে রাখেন, আমরা কী করব?”

৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে গণপরিবহনগুলোতে। মাস্ক তো পরতেই হবে, গাড়িতে ওঠার সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাড়তি ভাড়া আদায় করা হলেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। বাসে দুই সিটে একজন যাত্রী থাকলেও দাঁড়িয়েও যেতে দেখা গেছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অধিকাংশ বাসে পাশাপাশি দুটি আসনের একটি আসনে যাত্রী আছে। এক্ষেত্রে যাত্রীরাই পাশের আসনে অন্য কাউকে বসতে দিচ্ছেন না। কিন্তু আসন না পেলেও কাউকে দেখা গেল দাঁড়িয়ে যেতে। অধিকাংশ বাসেই ছিল না হ্যান্ড সানিটাইজার। মাস্কও দেখা যায়নি অনেকের মুখে।

জানতে চাইলে মিডলাইন পরিবহনের চালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘যে পরিমাণ বাস থাকা দরকার সেই পরিমাণ নেই। অনেক জায়গায় যাত্রীরা সড়ক আটকে মিছিলও করেছে। যাত্রীরা জোর করে বাসে উঠতে চাচ্ছে। এখন তাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করলে সবাই বলবে পরিবহনের লোকজন খারাপ।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যতো নিয়ম করা হয়েছে সব যাত্রীর সুরক্ষার জন্য। এখন তারা যদি না মানেন তবে আমাদের কী করার আছে। যাত্রীদের মানা করলে তারা তো উল্টো বলে, ক্ষতি হলে আমার হবে!
৬নং মতিঝিল-বনানী ট্রান্সপোর্টে দেখা গেছে পাশাপাশি দুটি আসনের মধ্যে একটি আসনেই যাত্রী বসেছেন। কিন্তু পরিবহনটির মাঝের বড় অংশ ফাঁকা। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে মতিঝিল এলাকায় বাসটিতে কয়েকজন যাত্রীকে দাঁড়িয়েও থাকতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চালক তড়িঘড়ি করে বলেন, ‘এরা এখনই নেমে যাবেন।

একই চিত্র দেখা গেছে লেগুনাসহ অন্য পরিবহনগুলোতেও। খিলগাঁও রেলগেট থেকে গুলিস্তান রুটের প্রতিটি লেগুনায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু যাত্রী নেওয়া হয়েছে গাদাগাদি করেই।
এসময় স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানতে চাইলে এক চালক বলেন, লেগুনার অনুমোদন নেই। এখানে স্বাস্থ্যবিধিও নেই। আমরা তো কাউকে জোর করে তুলছি না। মানুষের মধ্যেই করোনার ভয় নেই।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার অফিসগুলোতে ৫০ শতাংশ জনবল দিয়ে পরিচালনা করার বিষয়টি নিশ্চিত না করেই ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলাচলের নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে দ্বিগুণ গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হতো।
পল্টন মোড়ে দেখা গেছে সদরঘাট-গাজীপুরে চলাচলরত ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের নির্ধারিত ৫০ শতাংশ আসন ভর্তি থাকলেও যাত্রী ওঠানো হচ্ছে আরও। বাসে ওঠার সময় সামছুদ্দিন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘৪০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একটা বাস পাইনি। এখন কি বাস বাড়ি যেতে পারবো না!

করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সরকারি নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে লঞ্চের ভাড়াও ৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে এই বাড়তি ভাড়া শুধু লঞ্চের ডেকের যাত্রীদের গুণতে হবে। কেবিনের ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে না।

বাড়তি ভাড়া বৃহস্পতিবার কার্যকর হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান।

এর আগে, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্রস্তাব মেনে বাস ভাড়াও ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বি আরটিএ)।

বুধবার নৌযান মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বি আইডবিøউটিএ। সেখানে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাইডলাইন অনুসরণ করে শুধুমাত্র করোনাভাইরাস সংক্রমণকালীন সময়ের জন্য প্রতিটি অভ্যন্তরীন নৌযানে ধারন ক্ষমতার ৫০ ভাগ যাত্রী নিয়ে চলাচল করার শর্তে বর্তমান ভাড়ার থেকে ৬০ ভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হোক।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষতে (বি আইডবিøউটিএ) নৌ পরিবহন মালিকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বি আইডবিøউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেকের কাছে নৌ পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ৬০ ভাগ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব ধরনের গণপরিবহনে এরই মধ্যে ধারণক্ষমতার ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলাচলের নির্দেশনা রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহনে ৬০ ভাগ ভাড়া বাড়ানো হয়, যা কার্যকর হয়েছে।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment