শ্রীলঙ্কার মতো সংকটের দিকে বাংলাদেশ? ডয়চে ভেলে’র বিশ্লেষণ

নারায়ণগন্জ নিউজ ২৪ ডট কম ডেস্কঃ গত কয়েক মাস ধরেই শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।দেশটির পেট্রোল, ওষুধ এবং বৈদেশিক রিজার্ভ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

যার ফলে সরকারের প্রতি ক্ষোভে ফুঁসে উঠে জনগণ রাস্তায় প্রতিবাদ করতে নামে। এক পর্যায়ে জনতা প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে এবং তার মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়।

জার্মানির ডয়চে ভেলে (ডিডাব্লিউ) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়ঃ ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝার কারণে বাংলাদেশের অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে তাদের দেশও ওইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ ৬১.৫২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। অর্থাৎ, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ৪৩.৮৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে রপ্তানি অবশ্য মন্থর গতিতে (৩২.৯২%) বেড়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম মূল উৎস বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স – আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালের প্রথম চার মাসে প্রায় ২০% কমে ৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে৷

‘বৈদেশিক রিজার্ভ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যাবে’

অর্থনীতিবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামের আশঙ্কা, রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় আসছে বছরগুলোতে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়তে পারে।

তিনি ডিডাব্লিউ কে বলেন, “আমাদের আমদানি এই বছরের মধ্যেই ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছুবে, অথচ রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। ৩৫ বিলিয়ন ডলারের এই বাণিজ্য ঘাটতি কেবল রেমিট্যান্স দিয়ে পূরণ করা যাবে না৷ এ বছর আমাদের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি নিয়ে চলতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন, গত আট মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তিনি উদ্বিগ্ন যে আগামী মাসগুলোতে সেটা আরও কমতে পারে।

সম্ভবত আরও ৪ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে।
“যদি রপ্তানির বিপরীতে আমদানি বেশির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে এবং আমরা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে এই ব্যবধান কমাতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিপজ্জনক স্তরে নেমে যাবে।তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, সেটা মার্কিন ডলারের তুলনায় দেশের মুদ্রাকে উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের দিকে নিয়ে যাবে।

‘শ্বেত-হস্তী’ প্রকল্পগুলোর জন্য ব্যাপক ঋণ?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশও শ্রীলঙ্কার মতো ব্যয়বহুল কিন্তু সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রকল্পে বিদেশী ঋণ নিয়েছে যাকে সমালোচকরা “শ্বেত-হস্তী'” প্রকল্প বলে থাকেন।

মইনুল জানান, এ সমস্ত “অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প” সমূহের ঋণ পরিশোধের সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, “মাত্র ২,৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমরা রাশিয়ার কাছ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছি। আমরা ২০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারবো। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।

এটি “শ্বেত-হস্তী'” প্রকল্পের একটি বাজে নমুনা।

মইনুলের অনুমান, বিদেশী ঋণের জন্য কিস্তি হিসেবে বাংলাদেশকে ২০২৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৪ বিলিয়ন ডলার করে পরিশোধ করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমি আশঙ্কা করছি যে, মেগা প্রকল্পগুলো থেকে আয়ের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ ওই সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না।

ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রকল্পগুলো বাড়তি খরচ এবং বিলম্ব ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে। আমাদের মেগা প্রকল্পগুলো সতর্কতার সাথে শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে, অবহেলা ও দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই।

ওই প্রকল্পগুলোতে বিলম্ব করা বা বিদ্যমান বাজেট বাড়ানো উচিত নয়, মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যদি আমরা এগুলো সময়মতো শেষ করতে পারি, তবেই আমরা এসবের জন্য যে ঋণ নিয়েছি তা পরিশোধ করতে পারবো।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দরিদ্র মানুষকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে

ঋণ এবং বাণিজ্য ঘাটতির সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি। এতে সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশ প্রচণ্ড যন্ত্রণা ভোগ করছে।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এই কারণে যে দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোজ্যতেল, গম এবং অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর পাশাপাশি জ্বালানিও আমদানি করে থাকে।

এসব জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় গরীব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মন্তব্য করে নাজনীন বলেন, “সরকারকে দরিদ্র মানুষদের জন্য পণ্যসামগ্রীতে ভর্তুকি দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে তাদের অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা উচিত।

তবে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদী এই কারণে যে বিশ্ব অর্থনীতি করোনা মহামারী-র কারণে উদ্ভূত মন্দা থেকে বেরিয়ে আসার অবস্থায় থাকায় বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর উন্নতি হতে পারে। তিনি ডিডাব্লিউ কে বলেন, “আমরা করোনা মহামারী থেকে বের হওয়ার পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি পর্যবেক্ষণ করছি। ইউক্রেন যুদ্ধ এতে আরও অনিশ্চয়তা যোগ করেছে এবং শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটও আমাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। তবুও, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যদি বড় কিছু না হয় তবে বিশ্ব অর্থনীতি ফের ঘুরে দাঁড়াবে।

জনগণকে অর্থ ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ব্যয় কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাঁচাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকার কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থগিত করেছে যেগুলোর জন্য অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করতে হতো।

শেখ হাসিনা নাগরিকদের অর্থ ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার এবং পরিমিতিবোধ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান। প্রধানমন্ত্রী এর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এবার তিনি বেসরকারি খাত এবং জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মইনুল ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্যাপক জনদুর্ভোগের কারণে সরকারকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ইতিমধ্যেই সৃষ্ট বড় মাপের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

“বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনটি ভালো ছিল না। এটি ছিল জালিয়াতিপূর্ণ। আগামী দুই বছরের মধ্যে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সেটাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা কোনো আসন্ন অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখতে পাচ্ছেন না, তবে তারা এটা বিশ্বাস করেন যে; শ্রীলঙ্কা এখন যে পরিস্থিতির সম্মুখীন বাংলাদেশ যেনো শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য সুশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

(অনুবাদ- তারিক চয়ন)

সুত্র,অনলাইন মানবজমিন

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment