নাটকীয় সিদ্ধান্তে হরেক-রকম দুর্ভোগে মানুষ

নারায়ণগন্জ নিউজ ২৪ ডট কম : কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রোববার থেকে রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণার পর শনিবার ঢাকামুখী মানুষের ঢল নামে। রোববার থেকে খুলেছে শিল্পকারখানা। কাজে যোগ দিয়েছেন বেশিরভাগ শ্রমিক। তাদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধায় চালু হয়েছে, গণপরিবহন।

বাসের পাশাপাশি ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য যানবাহনে কর্মস্থলে যোগ দিতে বিভিন্ন জেলা থেকে রওনা হন লোকজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে বাস ও লঞ্চ চলাচল করার কথা থাকলেও সব জায়গায় তা ছিলো উপেক্ষিত। তবে ১২টা পর্যন্ত চলাচল করার ঘোষণা দিলেও যাত্রীদের অভিযোগ, সব গণপরিবহন চলছে না, ভাড়া নিচ্ছে ৩-৪ গুণ বেশি, অন্যদিকে লঞ্চে দাঁড়ানোর মতো জায়গা না থাকলেও লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ২৫০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা নিচ্ছে। এর মধ্যেও কাজে যোগ দিয়েছেন বেশিরভাগ শ্রমিক।

বাস মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হঠাৎ করে সরকার অনুমতি দিলেও প্রস্তুতি না থাকায় সকল বাস চালু করা সম্ভব হয়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে খুব কম সংখ্যক বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। দূরপাল্লার বাস দেখা যায়নি বল্লেই চলে। এছাড়া বরিশাল থেকে ছাড়েনি, রাজধানীমুখী কোনো লঞ্চ।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বাংলাদেশ বলেন, শ্রমিকদের জন্য ১৬ ঘন্টা বাস চালু থাকবে সরকার থেকে সিদ্বান্ত হয়েছে রাতে। অনেকদিন পর হঠাৎ করে বাস চালু করা সহজ কাজ না। বাসগুলো ঠিক না করে রাস্তায় বের হলে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে যতোটা সম্ভব হয়েছে চালু হয়েছে।

বাসের দূর্ভোগ ছাড়াও যোগ হয়েছে লঞ্চে ভাড়া বৃদ্বির ভোগান্তি। যশোর থেকে কাজে ফেরার উদ্দেশ্য ঢাকায় ফিরছেন রফিক মিয়া। গাবতলির আমিন বাজার ব্রিজে হেটে আসার সময় কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘গরিব মারা ব্যবসা শুরু করছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। সব বন্ধ কইরা দিয়া আবার অফিস চালু কইরা দিয়া আসতে কয়। আমার কিভাবে আসবো?’ প্রশ্ন করে বলেন, ‘সব কিছুর ভাড়া তিন-চার গুণ। বাস ও পায়নি।’
এদিকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঈদে বাড়ি গিয়ে কঠোর বিধিনিষেধে আটকে পড়া শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে সীমাহীন দুর্ভোগ সয়ে কর্মস্থলে ফিরছেন।

ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অতিরিক্ত গাড়ির চাপে বিভিন্ন অংশে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে বাড়তে থাকে ভিড়। যাত্রীদের অভিযোগ, ফেরিঘাট পর্যন্ত আসতে তাদের গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া।

সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ চললেও, সড়কে বেড়েছে গাড়ির চাপ। ঢাকায় ফেরা মানুষের ভিড় রয়েছে, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া, মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও ভোলার ইলিশা ঘাটে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে লঞ্চ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যার কারণে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে কর্মস্থলমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তবে সরকার অনুমতি দিলেও প্রস্তুতি না থাকায়, বরিশাল থেকে ছাড়েনি রাজধানীমুখী কোনো লঞ্চ।

রোববার সকাল থেকে সাভারের বিভিন্ন মহাসড়কে পরিবহনের চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি ট্রাকের চাপ বেশি বলে জানা গেছে। নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের জিরানীবাজার থেকে বাইপাইল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কে যানজটে আটকা পড়েছে যাত্রীরা।

রোববার সকাল থেকে মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব, এলেঙ্গা, পুংলি, রাবনা বাইপাস এলাকায় থেমে থেমে পরিবহন চলাচল করতে দেখা গেছে।

ঢাকামুখী শ্রমিকরা জানান, স্বল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালু করায় কর্মস্থলে ফেরা মানুষ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গাদাগাদি করে ফিরছেন। সেই সঙ্গে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। তবে চাকরি বাঁচাতে বাধ্য হয়েই এভাবে কর্মস্থলে ফিরতে হচ্ছে।

এদিকে গণপরিবহণ চালুর দিনে আজ অধিকাংশ চেকপোস্টই ফাঁকা দেখা গেছে। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।

তবে বিধিনিষেধের প্রথম তিন-চারদিন বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে তল্লাশি ও জিঙ্গাসাবাদের কারণ জানতে চাইলেও বর্তমানে চেকপোস্টে তল্লাশি কার্যক্রমে শিথিলতা লক্ষ্য করা গেছে। পাশাপশি সেনাবাহিনী এমনকি বিজিবির টহলও দেখা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও অনেকটাই নমনীয় দেখা গেছে।

মহাসড়কে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, সরকার কর্তৃক নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ নিয়োজিত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো দুর্ঘটনা বা যানজট হয়নি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাহাতাব উদ্দিন লেন, বিধিনিষেধ আমরা কঠোর ভাবেই পালন করছি। তবে শিল্পকারখানা খোলায় কর্মস্থলে ফেরার সুবিধায় তাদেরকে আটকানো হচ্ছে না। যারা জরুরী প্রয়োজনে বের হচ্ছে আমরা তাদেরকেই জিঙ্গাসাবাদ করছি।

এদিকে রাজধানীসহ এর আশেপাশের বিভিন্ন শিল্প কারখানার কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীর ছয়শো ও ইপিজেড, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের আটশো কারখানায় দেখা গেছে কর্মচাঞ্চল্য। সাভার ও আশুলিয়া এলাকার শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের কাজে দেখা গেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাবতলী সেতু এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, ঢাকা থেকে সাভার, মানিকগঞ্জ, হেমায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর যেতে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেতুর মুখে। সাভার, হেমায়েতপুর, আরিচা ঘাট পর্যন্ত সেতু থেকে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। তবে ভাড়া স্বাভাবিকের দ্বিগুণ। জনপ্রতি ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।

সিরাজগঞ্জ থেকে উত্তরের পথে যাত্রীরা যাচ্ছে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কারে। চলমান কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের ঢাকা আসার সুবিধার্থে শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দিয়েছে সরকার। ফলে চলাচল করছে সব ধরনের গণপরিবহন। কিন্তু এক দিনের এই শিথিলতায় গণপরিবহনগুলোতে আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া।

কলেজগেট থেকে বাংলামোটরের উদ্দেশ্যে লাব্বাইক গাড়িতে ওঠেন হামিদ। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, সরকার সব গাড়ির ভাড়া ৬০ শতাংশ বেশি নির্ধারণ করেছে। গাড়িতে আজ সরকার নির্ধারিত ভাড়ার থেকেও বেশি ভাড়া নিচ্ছে। দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হচ্ছে। ১৫ টাকার রাস্তা ৩০ টাকা ভাড়া নিয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় লাব্বাইক গাড়ির চালকের সহকারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, কাল গাড়ি চলাচলের খবর শুনে রাত ১টায় গাড়ি নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে গেছি। সারারাত জেগে বসেছিলাম সকালে যাত্রী নিয়ে আসবো বলে। কিন্তু তেমন যাত্রী নাই। সকালে আমরা থাকা অবস্থায় ঘাটে তিনটা ফেরি এসেছে। তিন ফেরিতে মোট যাত্রী এসেছে ২৫ থেকে ২৬ জন। কাল গাড়ি বের করে আজ পর্যন্ত ৪ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু যাত্রী পাচ্ছি না। গাড়ি নিয়ে গিয়ে মালিককে টাকা দিতে হবে। কিন্তু পাবো কই। আবার কত দিন গাড়ি চালাতে পারবো না কে জানে। এই জন্যই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া একটু বেশি নিচ্ছি।
’কল-কারখানা খোলার ফলে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ থাকায় ১২ ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে সোমবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বি আইডবিøউটিএ)।

রবিবার দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বি আইডবিøটিএ) কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার।
তিনি বলেন, যাত্রীর চাপ না কমায় আপাতত সোমবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের সময় বাড়ানো হয়েছে

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment