আমি নিজের হাতে নিজে বন্দি : প্রধানমন্ত্রী

নারায়ণগন্জ নিউজ ২৪ ডট কমঃ করোনার কারণে দুই বছর বাইরের কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারায় আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নিজের হাতে নিজে বন্দি’।

বুধবার আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এমনটা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা দীর্ঘ বক্তৃতা রাখেন। এক ঘণ্টা ব্যাপী দেওয়া বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন পর মন খুলে কথা বললাম’।

এ সময় তিনি হেসে বলেন, আসলে করোনাভাইরাস বন্দি করে রেখে দিয়েছে আমাকে। ২০০৭ সালে ছিলাম তত্তাবধায়ক সরকারের হাতে বন্দি। এখন আমি নিজের হাতে নিজে বন্দি।

এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সুস্বাস্থ্য কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নেতাকর্মীদের বৃক্ষ রোপণেরও নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে দেশে ফিরে এসেছি । ১৫ আগস্ট শুধু আমরা হারাইনি। বাংলাদেশের মানুষ হারিয়েছে তাদের উন্নতির সব সম্ভাবনা। যুগ যুগ ধরে করে এদেশের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। জাতির পিতা চেয়েছিলেন সেই বঞ্চনা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। তার নেতৃত্বে এদেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিল এই দেশকে। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি দেশে ফিরে এসেছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারকে হারিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে খুজে পেয়েছিলাম আমার বাবা-মা-ভাইসহ হারানো স্বজনদের।

সেই সময়ের যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দুই বোন বেঁচেছিলাম বিদেশে ছিলাম বলে। কিন্তু এ বেঁচে থাকা বাঁচা ছিল না। এটা ছিল মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচা।

এদিকে দেশের পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যটকদের জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নবনির্মিত বহুতল ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ভূখÐ রক্ষায় সবার দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তাহলে এই সমুদ্রসীমা, পাহাড় সবকিছু মিলিয়ে অত্যন্ত চমৎকার একটি ভুখন্ড আমরা পেয়েছি, যেটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন।

এই ভূখন্ডকে আকর্ষণীয় করা, উন্নত করা এবং এর প্রাকৃতিক পরিবেশটা রক্ষা করা- এটা আমাদের সকলেরই একান্তভাবে প্রয়োজন।

কোভিড মহামারীতে পর্যটনের ক্ষতি হলেও ওই সময়ে কক্সবাজারের ভিড় কমায় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভালো কিছ্ওু যে হয়েছে, সে কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, একটা উপকার আমরা পেয়েছি। যেহেতু কোনো পর্যটক সেখানে যেতে পারে নাই, কক্সবাজারে হারিয়ে যাওয়া লাল কাঁকড়া, সেগুলো যেমন ফিরে এসেছে, কিছুদিন ডলফিনও দেখা গেছে, আমাদের কাছিমগুলো, তাদের প্রজনন ক্ষেত্র ছিল সেগুলোও কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছিল।

সৈকতে লাল কাঁকড়ার বসবাসের জায়গা এবং কাছিমের প্রজননক্ষেত্রগুলো বেড়া দিয়ে সংরক্ষণ করতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও অনুষ্ঠানে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পর্যটকদের জন্য ব্যবস্থা থাকবে, সাথে সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলো যেন নষ্ট না হয়।

ছোটবেলায় সৈকতে লাল কাঁকড়ার পেছনে ছোটার গল্প অনুষ্ঠানে শুনিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কোনোদিন ধরতে পারিনি। এরা এত চালাক থাকত, দৌড়াতে দৌড়াতে কখন যে গর্তে ঢুকে যেতৃ। চেষ্টা করেছি বের করতে, কিন্তু কখনো পারিনি। এই স্মৃতিগুলো ভুলব কি করে!

কক্সবাজারকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারবাসীর উদ্দেশে বলেন, “যেখানে সেখানে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে কোনো স্থাপনা আপনারা করবেন না।

কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

পুরো কক্সবাজারকে ঢেলে সাজাতে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এর উন্নয়নটা অপরিকল্পিতভাবে না হয়ে যেন মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী হয়, আর আমাদের এই যে বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে, এটাতে পর্যটনের ক্ষেত্রটা আরও প্রসারিত করা, আমার দেশি পর্যটকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা পাশপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্যও আকর্ষণীয় করা। এই উদ্যোগটাই আমরা নিতে চাচ্ছি।

সরকারপ্রধান বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরহারা বহু মানুষ কক্সবাজারের একটা বস্তিতে বসবাস করা শুরু করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলোর পুনর্বাসনের জন্য সরকার তাদের খুরুশকুলে বহুতল ভবন নির্মাণ করে দেয়।

কক্সবাজারের মৎস্যজীবীদের জন্য আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও উন্নতমানের শুঁটকির হাট করার পরিকল্পনার কথাও প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন।

কক্সবাজারে লবণ চাষ এবং চাষীদের জন্য সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় এসে প্রথমবারের মত লবণ চাষীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে, তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়েছে।

লবণের চাহিদা কোনো দিন ফুরাবে না। বিদেশে বরফ গলানোর জন্য অপরিশোধিত লবণ ব্যবহার করা হয়।…আমরা যদি সেভাবে লবণ উৎপাদন বাড়াতে পারি, রপ্তানিও করতে পারব। দেশের চাহিদাও মেটাতে পারব, যেটা পরিশোধিত লবণৃ।

তাই লবণ উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চাষিদের উন্নয়নে ‘বিশেষ দৃষ্টি রাখার’ জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি তাগিদ দেন সরকারপ্রধান।
ঝড়, জলোচ্ছ¡াস থেকে রক্ষা পেতে কক্সবাজারের পুরো সমুদ্র সৈকত ঘন ঝাউবন দিয়ে ঘিরে দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে সমুদ্রসীমা আইন করে দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর যারা একের পর এক ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা বাংলাদেশের যে সমুদ্রসীমায় অধিকার রয়েছে, এই বিষয়টা নিয়ে কখনোই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

আওয়ামী লীগ সরকারে ফেরার পর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “এখন এই সমুদ্র সম্পদ আমাদেরকে ব্যবহার করে আমাদের অর্থনীতিতে যাতে অবদান রাখতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা আমরা করতে চাই। তাই আমরা বøু ইকোনমি অর্থাৎ সুনীল অর্থনীতি আমরা গ্রহণ করেছি এবং এরই ভিত্তিতে আমরা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে চাই।

Please follow and like us:

Related posts

Leave a Comment